জীববিজ্ঞান প্রথম পত্র

(একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণি)

অষ্টম অধ্যায়: টিস্যু ও টিস্যুতন্ত্র


বহুকোষী ভ্রূণ বিকশিত হয়ে চারাগাছ হয় এবং চারাগাছ পর্যায়ক্রমে বর্ধিত হয়ে বিশাল গাছে পরিণত হয়। তারপর ফুল, ফল ও বীজ ধারণ করে। গাছের এ পরিপূর্ণতার মূলে রয়েছে বিভিন্ন ধরনের টিস্যু। গাছের বর্ধন আরম্ভ হয় ভাজক টিস্যু দিয়ে, ভাজক টিস্যুর বিভাজনের ফলে সৃষ্টি হয় বিভিন্ন ধরনের স্থায়ী টিস্যু। আর স্থায়ী টিস্যুগুলো মিলিত হয়ে টিস্যু তন্ত্র গঠন করে। টিস্যু তন্ত্রগুলো পরিপূর্ণ গাছ গঠন করে।

টিস্যু: একই উৎস থেকে সৃষ্ট, একই ধরনের কাজ সম্পন্নকারী সমধর্মী একটি অবিচ্ছিন্ন কোষগুচ্ছকে টিস্যু বা কোষ কলা বলা হয়। উদ্ভিদের দেহ গঠনকারী কোষের শ্রমবিভাগই হলো টিস্যু সৃষ্টির মূল কারণ ।

টিস্যুর প্রকারভেদ:
টিস্যু গঠনকারী কোষের বিভাজন ক্ষমতা অনুযায়ী একে দুটি ভাগে ভাগ করা হয়েছে। যথা- ভাজক টিস্যু এবং স্থায়ী টিস্যু।

ভাজক টিস্যু:
যে টিস্যুর কোষগুলো বিভাজনে সক্ষম অর্থাৎ যে টিস্যুর নতুন কোষ উৎপন্ন করার ক্ষমতা থাকে তাকে ভাজক টিস্যু বলে। ভাজক টিস্যু যে সমস্ত কোষ দ্বারা গঠিত তাদেরকে ভাজক কোষ বলে।

গঠন:
ভাজক টিস্যু সাধারণত অত্যন্ত ক্ষুদ্র, আয়তাকার, ডিম্বাকার বা বহুভ‚জাকার। এদের কোষে অধিক পরিমাণ সাইটোপ্লাজম থাকে এবং এতে কোন গহ্বর থাকে না অথবা থাকলেও অত্যন্ত ক্ষুদ্র। এদের নিউক্লিয়াস বেশ বড়, কোষ প্রাচীর অত্যন্ত পাতলা এবং দুটি কোষের মধ্যে আন্ত কোষীয় ফাঁক স্থান থাকে না।

অবস্থান:
সাধারণত উদ্ভিদ দেহের বর্ধিষ্ণু অঞ্চলে (যে স্থানে উদ্ভিদ বৃদ্ধি পায়) অর্থাৎ মূল, কান্ড ও পাতার অগ্রভাগে থাকে।

কাজ:
১। ভাজক টিস্যুর বিভাজনের ফলে উদ্ভিদের দৈর্ঘ্য বৃদ্ধি পায় অর্থাৎ এরা লম্বা হয় এবং এদের ব্যাস বৃদ্ধি পায়।
২। ভাজক টিস্যু থেকে স্থায়ী টিস্যু সৃষ্টি হয়।

ভাজক টিস্যুর প্রকারভেদ:
(ক) উৎপত্তি,
(খ) অবস্থান,
(গ) বিভাজন প্রক্রিয়া এবং
(ঘ) কাজ ইত্যাদির উপর ভিত্তি করে ভাজক টিস্যুকে বিভিন্নভাবে ভাগ করা হয়।

(ক) উৎপত্তি অনুসারে ভাজক টিস্যুর প্রকারভেদ:
উৎপত্তি অনুসারে ভাজক টিস্যু দু’প্রকার। যথা-
১। প্রাথমিক ভাজক টিস্যু ও
২। সেকেন্ডারি ভাজক টিস্যু।

১। প্রাথমিক ভাজক টিস্যু-
যে ভাজক টিস্যু উদ্ভিদের ভ্রূণাবস্থায় সৃষ্টি হয় তাকে প্রাথমিক ভাজক টিস্যু বলে। উদ্ভিদের মূল, কান্ড ও পাতার অগ্রভাগে ভাজক টিস্যু থাকে। এদের বিভাজনের ফলে উদ্ভিদ দৈর্ঘ্যে বৃদ্ধি পায়। প্রাথমিক ভাজক টিস্যু থেকে প্রাথমিক স্থায়ী টিস্যুর সৃষ্টি হয়।

২। সেকেন্ডারি ভাজক টিস্যু-
সাধারণভাবে স্থায়ী টিস্যু বিভাজনক্ষম নয়। উদ্ভিদের সেকেন্ডারি বৃদ্ধির জন্য কোন কোন স্থায়ী টিস্যুর কোষগুলো বিভাজন ক্ষমতাপ্রাপ্ত হয়, ফলে যে ভাজক টিস্যু সৃষ্টি করে তাকে সেকেন্ডারি ভাজক টিস্যু বলে। যে সব কোষের বিভাজন ক্ষমতা নেই সে সব টিস্যু থেকে উৎপন্ন হয় বলে এদের সেকেন্ডারি ভাজক টিস্যু বলা হয়। সেকেন্ডারি ভাজক টিস্যু সব সময় পার্শ্বীয়। এ টিস্যুর বিভাজনের ফলে উদ্ভিদের সেকেন্ডারি বৃদ্ধি হয় অর্থাৎ উদ্ভিদ পাশে বৃদ্ধি পায় বা এর বেড় মোটা হয়। ইন্টারফ্যাসিকুলার ক্যাম্বিয়াম, ফেলোজেন বা কর্ক ক্যাম্বিয়াম হচ্ছে সেকেন্ডারি ভাজক টিস্যু।

(খ) অবস্থান অনুসারে ভাজক টিস্যুর প্রকারভেদ:
অবস্থান অনুসারে প্রাথমিক ভাজক টিস্যুকে তিন ভাগে ভাগ করা হয়। যথা-
১। শীর্ষস্থ ভাজক টিস্যু,
২। ইন্টারক্যালারি বা নিবেশিত ভাজক টিস্যু ও
৩। পার্শ্বীয় ভাজক টিস্যু।

১। শীর্ষস্থ ভাজক টিস্যু-
যে ভাজক টিস্যু উদ্ভিদের মূল, কান্ড বা শাখা প্রশাখার শীর্ষে থাকে তাদের শীর্ষস্থ ভাজক টিস্যু বলে। এরা প্রাইমারি টিস্যু। এদেরকে আদি ভাজক টিস্যুও বলা হয়। এ টিস্যুর বিভাজনের ফলে উদ্ভিদের মূল, কান্ড ইত্যাদি দৈর্ঘ্যে বৃদ্ধি পায়। এরা প্রাথমিক স্থায়ী টিস্যু তৈরি করে। উন্নত শ্রেণীর উদ্ভিদের শীর্ষস্থ ভাজক টিস্যু একাধিক কোষ দ্বারা গঠিত।

২। ইন্টারক্যালারি বা নিবেশিত ভাজক টিস্যু-
যে ভাজক টিস্যু দুটি স্থায়ী টিস্যুর মধ্যবর্তী স্থানে অবস্থান করে তাকে নিবেশিত ভাজক টিস্যু বলে। এরা শীর্ষস্থ ভাজক টিস্যুর অংশ কিন্তু এর নিম্নে বা উর্ধ্বে স্থায়ী টিস্যু উৎপন্ন হওয়ার ফলে এরা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। এরা প্রাথমিক টিস্যু। উদ্ভিদের পত্রমূলে, মধ্যপর্বের গোড়ায় বা পর্বসন্ধির নিচে থাকতে পারে। Equisetum কান্ডে, পাইন গাছে, ঘাসসহ একবীজপত্রী অনেক উদ্ভিদের পাতায় ও কান্ডে এ প্রকার ভাজক টিস্যু পাওয়া যায়।

৩। পার্শ্বীয় ভাজক টিস্যু-
যে ভাজক টিস্যু উদ্ভিদের মূল বা কান্ডের পার্শ্ব বরাবর লম্বালম্বিভাবে অবস্থান করে তাদেরকে পার্শ্বীয় ভাজক টিস্যু বলা হয়। এ টিস্যুগুলোও দুটি স্থায়ী টিস্যুর মাঝখানে অবস্থিত। এ টিস্যুর বিভাজনের ফলে উদ্ভিদের দেহ প্রস্থে বৃদ্ধি পেয়ে মোটা হয়। ক্যাম্বিয়াম ও কর্ক ক্যাম্বিয়াম পার্শ্বীয় ভাজক টিস্যু।

(গ) বিভাজন প্রক্রিয়া অনুসারে ভাজক টিস্যুর প্রকারভেদ:
বিভাজন প্রক্রিয়ার ভিন্নতার উপর ভিত্তি করে ভাজক টিস্যুকে তিনভাগে বিভক্ত করা হয়। যথা-
১। মাস ভাজক টিস্যু,
২। রিব ভাজক টিস্যু ও
৩। প্লেট ভাজক টিস্যু।

১। মাস ভাজক টিস্যু-
যে ভাজক টিস্যুর কোষ সব তলেই বিভাজিত হয় তাকে মাস ভাজক টিস্যু বলে। এ প্রকার বিভাজনের ফলে উদ্ভিদ দেহের আয়তন বাড়ে। যেমন- কর্টেক্স, এন্ডোস্পার্ম।

২। রিব ভাজক টিস্যু-
যে ভাজক টিস্যুর কোষগুলো মাত্র একটি তলে বিভক্ত হয় তাকে রিব ভাজক টিস্যু বলে। এ ধরনের বিভাজনের ফলে এক সারি কোষ সৃষ্টি হয়। যেমন- মূল ও কান্ডের মজ্জা।

৩। প্লেট ভাজক টিস্যু-
যে ভাজক টিস্যুর কোষগুলো দুটি তলে বিভক্ত হয় তাদের প্লেট ভাজক টিস্যু বলা হয়। যেমন পাতার টিস্যু।

(ঘ) কাজ অনুসারে ভাজক টিস্যুর প্রকারভেদ :
কাজ অনুসারে ভাজক টিস্যুকে তিনভাগে ভাগ করা হয়। যথা-
(ক) প্রোটোডার্ম
(খ) প্রোক্যাম্বিয়াম এবং
(গ) গ্রাউন্ড ভাজক টিস্যু।

১। প্রোটোডার্ম-
ভাজক টিস্যুর সবচেয়ে বাইরের স্তরকে প্রোটোডার্ম বলা হয়। এ ধরনের ভাজক টিস্যুর কোষগুলো বিভক্ত হয়ে মূল ও কান্ডের ত্বক বা এপিডার্মিস তৈরি করে।

২। প্রোক্যাম্বিয়াম-
এ ভাজক টিস্যুর কোষ বিভাজনের ফলে উদ্ভিদের পরিবহন টিস্যুগুচ্ছ তৈরি হয় অর্থাৎ জাইলেম, ফ্লোয়েম এবং ক্যাম্বিয়াম ইত্যাদি তৈরি হয়।

৩। গ্রাউন্ড মেরিস্টেম-
আদি ভাজক টিস্যুর যে অংশটি উদ্ভিদের কর্টেক্স, পরিচক্র, মজ্জারশ্মি ও মজ্জা ইত্যাদি তৈরি করে তাদেরকে গ্রাউন্ড মেরিস্টেম বলা হয়।




প্রধান শব্দভিত্তিক সারসংক্ষেপ

♦ কোষ : কোষ হলো জীবদেহের গঠন ও কাজের একক, যা স্বনির্ভর ও আত্মপ্রজননশীল, বৈষম্যভেদ্য পর্দা দিয়ে পরিবেষ্টিত অবস্থায় নির্দিষ্ট পরিমাণ প্রোটোপ্লাজম নিয়ে গঠিত এবং পূর্বতন কোষ থেকে সৃষ্ট।