জীববিজ্ঞান প্রথম পত্র

(একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণি)

ষষ্ঠ অধ্যায় : ব্রায়োফাইটা ও টেরিডোফাইটা




ব্রায়োফাইটা


ব্রায়োফাইটার মূল উদ্ভিদ গ্যামিটোফাইট (হ্যাপ্লয়েড), এদের দেহ থ্যালাস প্রকৃতির অথবা ‘কান্ড’ ও ‘পাতায়’ বিভক্ত। এদের কোনটিতেই মূল থাকে না। মূলের পরিবর্তে এককোষী অথবা বহুকোষী রাইজয়েড থাকে। এদের পরিবহন কলাতন্ত্র অনুপস্থিত। এ অধ্যায়ে ব্রায়োফাইটার বৈশিষ্ট্য এবং প্রতিনিধি হিসেবে Riccia এর আবাস ও গঠন সম্পর্কে বর্ণনা করা হবে। কিছু কিছু উদ্ভিদ আছে যাদের ফুল হয়। এদেরকে সপুষ্পক উদ্ভিদ বলা হয়। আবার কিছু কিছু উদ্ভিদের ফুল হয় না। এদেরকে অপুষ্পক উদ্ভিদ বলা হয়। ব্রায়োফাইটা এবং টেরিডোফাইটা গ্রুপের উদ্ভিদসমূহ হলো অপুষ্পক উদ্ভিদ। আবার শৈবাল এবং ছত্রাকও অপুষ্পক উদ্ভিদ। তবে শৈবাল ও ছত্রাক হলো নিম্নশ্রেণির অপুষ্পক এবং ব্রায়োফাইটা ও টেরিডোফাইটা হলো উচ্চশ্রেণির অপুষ্পক উদ্ভিদ। কারণ ব্রায়োফাইটা ও টেরিডোফাইটা বৈশিষ্ট্যের দিক থেকে শৈবাল ও ছত্রাক থেকে উন্নত ও জটিল প্রকৃতির। ব্রায়োফাইটা ও টেরিডোফাইটার মধ্যে টেরিডোফাইটা উন্নত। ব্রায়োফাইটা ও টেরিডোফাইটার মধ্যে বাহ্যিক মৌলিক পার্থক্য হলো ব্রায়োফাইটা উদ্ভিদসমূহকে মূল, কান্ড ও পাতায় বিভক্ত করা যায় না কিন্তু টেরিডোফাইটা উদ্ভিদসমূহকে সত্যিকার মূল, কান্ড ও পাতায় বিভক্ত করা যায়। এছাড়া ব্রায়োফাইটা অভাস্কুলার কিন্তু টেরিডোফাইটা ভাস্কুলার। অপেক্ষাকৃত কম উন্নত থ্যালোফাইটা (শৈবাল ও ছত্রাক) এবং উন্নত টেরিডোফাইটার মধ্যে সংযোগ সৃষ্টিকারী মধ্যবর্তী গ্রুপ হলো ব্রায়োফাইটা।
মারগুলিস (Margulis) এর শ্রেণিবিন্যাস অনুযায়ী ব্রায়োফাইটা একটি গ্রেড এবং বিভাগ। এ বিভাগে প্রায় পঁচিশ হাজার প্রজাতি রয়েছে। এদের অধিকাংশই স্থলজ, কিছু রয়েছে জলজ। স্থলজ প্রজাতিগুলোর জীবন চক্র সম্পন্ন করতে পানির দরকার হয়। তাই ব্রায়োফাইটাকে উভচর উদ্ভিদ বলা হয়। বাংলাদেশ থেকে এখন পর্যন্ত এ বিভাগের অর্ন্তভুক্ত ৩৪টি গোত্রের ২৪৮টি প্রজাতি শনাক্ত করা হয়েছে।

ব্রায়োফাইটা উদ্ভিদের বেশিষ্ট্য
১। এদের প্রধান দেহটি গ্যামিটোফাইটিক (হ্যাপ্লয়েড) অর্থাৎ গ্যামিট উৎপাদনকারী।
২। গ্যামোটোফাইট সবুজ, স্বভোজী, স্বাধীন ও স্বতন্ত্র।
৩। এরা থ্যালয়েড হতে পারে অথবা দেহ রাইজয়েড, কান্ড ও পাতার ন্যায় অংশে বিভক্ত।
৪। দেহে মূল সৃষ্টি হয় না। মূলের পরিবর্তে এককোষী রাইজয়েড সৃষ্টি হয়।
৫। এদের দেহে কোন পরিবহন টিস্যু থাকে না।
৬। জাইগোট হতে মাইটোটিক বিভাজনের মাধ্যমে ভ্রূণ সৃষ্টি হয়।
৭। এদের যৌন জনন ঊওগ্যামাস ধরনের। অর্থাৎ সচল ছোট শুক্রাণুর সাথে নিশ্চল বড় ডিম্বাণুর মিলন ঘটে।
৮। জননাঙ্গ বহুকোষী এবং চতুর্দিকে বন্ধ্যা কোষের আবরণ থাকে।
৯। এদের স্পোরোফাইট সর্বদাই পুষ্টি ও আশ্রয়ের জন্য আংশিক বা পূর্ণভাবে গ্যামিটোফাইটের উপর নির্ভরশীল।
১০। উন্নত ব্রায়োফাইট উদ্ভিদের পরিণত স্পোরোফাইট পদ, সিটা (বৃন্ত) এবং ক্যাপসুলে বিভক্ত। অনুন্নত উদ্ভিদের স্পোরোফাইটে পদ ও সিটা অনুপস্থিত, শুধুমাত্র গোলাকার ক্যাপসুল থাকে (যেমন Riccia)।
১১। সম আকৃতির রেণু সৃষ্টি করার জন্য ব্রায়োফাইটার প্রজাতিগুলো সকল ক্ষেত্রেই সমরেণুপ্রসু। এদের জীবন চক্রে অসম আকৃতির জনুক্রম বিদ্যমান থাকে।
১২। গ্যামিটোফাইট দীর্ঘস্থায়ী, বিষমপৃষ্ঠ এবং থ্যালাস শায়িত।

Riccia এর শ্রেণিবিন্যাস
বিভাগ- Bryophyta,
শ্রেণী- Hepaticae,
বর্গ- Marchantiales,
গোত্র- Ricciaceae


Riccia উদ্ভিদের বিভিন্ন প্রজাতি বাংলাদেশের প্রায় সর্বত্রই জন্মায়। Riccia একটি বড় গণ। প্রায় ২০০ প্রজাতি নিয়ে এ গণ গঠিত। Hepaticae শ্রেণির সদস্যদেরকে লিভারওয়ার্ট বলা হয়। এদের দেহকে থ্যালাস বলা হয়। থ্যালাসের আকৃতি মানুষের লিভারের ন্যায় তাই এরূপ নামকরণ করা হয়েছে। এখন পর্যন্ত বাংলাদেশ থেকে Riccia গণের ৪৫টি প্রজাতি শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে। নতুন প্রজাতিগুলোর মধ্যে রয়েছে R. bengalensis, R. dhakensis, R. chittagonensis ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য।

আবাসস্থল:
Riccia ব্রায়োফাইটার একটি সাধারণ পরিচিত গণ। এরা সাধারণত ভেজা, স্যাঁতস্যাতে মাটিতে, আর্দ্র দেয়াল, পুরানো ইট, নদীর কিনারায় বালিমাটি, বাগানে, নার্সারীর টব ইত্যাদি জায়গায় জন্মায়। Riccia fluitans ছাড়া Riccia এর বাকি সব প্রজাতি স্থলজ। বর্ষাকালে এরা অধিক জন্মায়।

Riccia এর গঠন

বাহ্যিক গঠন-
Riccia এর প্রধান দেহ লিঙ্গধর বা গ্যামিটোফাইট। এর দেহ থ্যালাস প্রকৃতির অর্থাৎ দেহকে মূল, কান্ড ও পাতায় বিভক্ত করা যায় না। থ্যালাস সবুজ, চ্যাপ্টা, বিষমপৃষ্ঠ, শায়িত ও দ্ব্যাগ্র শাখাবিশিষ্ট। থ্যালাসের উপরের পিঠে মধ্যভাগের স্ফীত অঞ্চলকে মধ্যশিরা বলে। থ্যালাসের প্রতিটি শাখার শীর্ষে একটি অগ্রস্থ খাঁজ থাকে। থ্যালাসের নিচের পিঠে অসংখ্য বহুকোষী শল্ক ও এককোষী রাইজয়েড উৎপন্ন হয়। রাইজয়েড মসৃণ অথবা অমসৃণ প্রাচীরবিশিষ্ট। রাইজয়েড পানি শোষণ করে এবং থ্যালাসকে মাটির সাথে আবদ্ধ রাখতে সহায়তা করে। শল্ক থ্যালাসের নিচে পানি ধারণ করে ও শীর্ষ কোষকে সংরক্ষণ করে।

অভ্যন্তরীণ গঠন-
প্রস্থচ্ছেদে থ্যালাসকে দুটি পৃথক অঞ্চলে দেখা যায়। যথা- (ক) উপরের দিকে ক্লোরোপ্লাস্টযুক্ত সালোকসংশ্লেষণকারি (ফটোসিনথেটিক) অঞ্চল এবং (খ) নিচের দিকে বর্ণহীন সঞ্চয়ী অঞ্চল।

সালোকসংশ্লেষণকারি অঞ্চল :
থ্যালাসের উপরের দিকে ক্লোরোপ্লাস্টযুক্ত খাড়া কোষের সারি দিয়ে এ অঞ্চল গঠিত। ক্লোরোপ্লাস্টযুক্ত এ সারিগুরোকে আত্তীকরণ সূত্র বলা হয়। এসব আত্তীকরণ সূত্রের মধ্যবর্তী সরু ও লম্বা নালীর ন্যায় বায়ুপূর্ণ স্থানকে বায়ু প্রকোষ্ঠ বলা হয়। প্রতিটি বায়ু প্রকোষ্ঠ একটি ছিদ্রপথে বাইরের সাথে যুক্ত থাকে। এ ছিদ্রপথকে বায়ুরন্ধ্র বলে। আত্তীকরণ সূত্রের বাইরের কোষগুলো কিছুটা বড় ও ক্লোরোপ্লাস্টবিহীন। বর্ণহীন এ কোষগুলো থ্যালাসের উপরিভাগে একটি অসম্পূর্ণ ঊর্ধ্বত্বক গঠন করে। বর্ণহীন একসারি কোষ দিয়ে থ্যালাসের ঊর্ধ্বত্বক গঠিত। এদের স্ত্রী জননাঙ্গের উপরে আর্কিগোনিয়াম এবং নিচের দিকে ডিম্বাণু উৎপন্ন হয়।

সঞ্চয়ী অঞ্চল :
থ্যালাসের সালোকসংশ্লেষণকারি অঞ্চলের নিচে এ অঞ্চল অবস্থিত। এ অঞ্চলটি কয়েকসারি বর্ণহীন প্যারেনকাইমা কোষ দ্বারা গঠিত এবং সাধারণত আন্ত:কোষীয় স্থান বিবর্জিত। এ সকল কোষে প্রচুর শ্বেতসার কণা সঞ্চিত থাকে। এছাড়াও এক সারি কোষ দ্বারা নিম্নত্বক গঠিত। নিম্নত্বক সুগঠিত। নিম্নত্বক থেকে এককোষী রাইজয়েড (মসৃণ ও অমসৃণ) এবং বহুকোষী শল্ক (Scale) নির্গত হয়।

Riccia এর শনাক্তকারী বৈশিষ্ট্য (থ্যালাসের প্রস্থচ্ছেদ)
১। এদের দেহ অর্থাৎ থ্যালাস মূল, কান্ড এবং পাতায় বিভক্ত নয়।
২। থ্যালাস সবুজ, শায়িত, চ্যাপ্টা এবং বিষমপৃষ্ঠ।
৩। থ্যালাস দ্ব্যাগ্র শাখাবিশিষ্ট এবং মধ্য শিরাবিশিষ্ট।
৪। প্রতিটি শাখার শীর্ষদেশে খাঁজ বিদ্যমান থাকে।
৫। থ্যালাসের নিচের পৃষ্ঠে দু’প্রকার এককোষী রাইজয়েড এবং বহুকোষী স্কেল (শল্ক) বিদ্যমান।
৬। থ্যালাসটি অভ্যন্তরীণভাবে সালোকসংশ্লেষণ এবং সঞ্চয়ী অঞ্চলে বিভক্ত।


টেরিডোফাইটা


টেরিডোফাইটা গ্রুপের উদ্ভিদসমূহ হলো অপুষ্পক উদ্ভিদ। আবার ব্রায়োফাইটা, শৈবাল এবং ছত্রাকও অপুষ্পক উদ্ভিদ। তবে শৈবাল ও ছত্রাক নিম্নশ্রেণির অপুষ্পক এবং ব্রায়োফাইটা ও টেরিডোফাইটা হলো উচ্চশ্রেণির অপুষ্পক উদ্ভিদ। কারণ, ব্রায়োফাইটা ও টেরিডোফাইটা বৈশিষ্ট্যের দিক থেকে শৈবাল ও ছত্রাক থেকে উন্নত ও জটিল প্রকৃতির। ব্রায়োফাইটা ও টেরিডোফাইটার মধ্যে টেরিডোফাইটা উন্নত। টেরিডোফাইটা উদ্ভিদসমূহকে সত্যিকার মূল, কান্ড ও পাতায় বিভক্ত করা যায়। এখানে উল্লেখ্য, যে সকল উদ্ভিদে পরিবহন টিস্যুগুচ্ছ থাকে (জাইলেম ও ফ্লোয়েম) তাদেরকে ট্রাকিওফাইটা উদ্ভিদ বলে। তম্মধ্যে টেরিডোফাইটাতে আদি প্রকৃতির এবং আবৃতবীজী উদ্ভিদে উন্নত প্রকৃতির পরিবহন টিস্যুগুচ্ছ থাকে। টেরিডোফাইটা গ্রিক শব্দ Pteron (পক্ষল বা ডানা) এবং Phyton (উদ্ভিদ) হতে Pteridophyta শব্দের উৎপত্তি। এরা হলো ডানাবিশিষ্ট উদ্ভিদ। মূল, কান্ড ও পাতা দ্বারা গঠিত এবং পরিবহন টিস্যুবিশিষ্ট অপুষ্পক স্বভোজী উদ্ভিদগুলো টেরিডোফাইটা নামে পরিচিত। পৃথিবীতে প্রায় দশ হাজার প্রজাতির টেরিডোফাইট উদ্ভিদ রয়েছে। বাংলাদেশ থেকে ৪১ গোত্রের ১৯৫ প্রজাতির টেরিডোফাইট নথিভুক্ত করা হয়েছে। টেরিডোফাইটা উদ্ভিদের মধ্যে অন্যতম কয়েকটি হলো Pteris, Psilotum, Lycopodium, Equisetum ইত্যাদি।

টেরিডোফাইটা উদ্ভিদের বেশিষ্ট্য ১। এদের প্রধান দেহটি স্পোরোফাইটিক এবং অপুষ্পক। ২। এরা অবীজী উদ্ভিদ। ৩। দেহ মূল, কান্ড ও পাতার ন্যায় অংশে বিভক্ত। ৪। এদের দেহে পরিবহন টিস্যু থাকে। ৫। জননাঙ্গ বহুকোষী এবং চতুর্দিকে বন্ধ্যা কোষের আবরণ থাকে। ৬। গ্যামিটোফাইট থ্যালাস প্রকৃতির এবং মোটামুটি স্বাধীন ও স্বতন্ত্র। এ পর্যায়কে প্রোথ্যালাস বলে। ৭। পুংগ্যামিটোফাইট সচল এবং অ্যান্থেরিডিয়ামে উৎপন্ন হয়। ৮। স্ত্রীগ্যামিটোফাইট নিশ্চল এবং আর্কিগোনিয়ামে উৎপন্ন হয়। ৯। ভ্রূণ সৃষ্টি হয়। ১০। অধিকাংশ সদস্যে কান্ড রাইজোমে পরিণত হয়। ১১। এদের অস্থানিক মূল বিদ্যমান। ১২। জীবনচক্রে সুস্পষ্ট হেটারোমরফিক জনুক্রম বিদ্যমান। ১৩। অধিকাংশ ক্ষেত্রে স্পোরোফিল ঘন সনিড়ববেশিত হয়ে স্ট্রোবিলাস গঠন করে।

Pteris : এ শ্রেণির উদ্ভিদগুলোকে সাধারণভাবে ফার্ণ বলা হয়। এরা স্পোরোফাইটিক উদ্ভিদ। এদের গ্যামিটোফাইটকে প্রোথ্যালাস বলে। কান্ড রাইজোম জাতীয় এবং বহুবর্ষজীবী। পাতা বড়, সরল অথবা যৌগিক। পত্রকের নিম্নপিঠে অথবা কিনারায় রেণুধারণকারী অঙ্গ জন্মায়।

Pteris এর শ্রেণিবিন্যাস বিভাগ- Filicophyta, শ্রেণী- Leptosporangiopsida, বর্গ- Filicales, গোত্র- Polypodiaceae|

আবাসস্থল: Pteris একটি অতি পরিচিত, বহুল বিস্তৃত ও সহজলভ্য ফার্ণ। এরা ‘সান ফার্ণ’ নামেও পরিচিত। শীতল এবং ছায়াযুক্ত ভেজা মাটিতে, পুরাতন প্রাচীরের গায়ে, বৃক্ষের বাকলে জন্মায়। সারা পৃথিবীতে Pteris এর প্রায় ২৫০টি প্রজাতি আছে। বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলায় Pteris এর ৬টি প্রজাতি আছে। এদের মধ্যে Pteris vittata বাংলাদেশের প্রায় সর্বত্র পাওয়া যায়। বিশেষ করে পুরানো ইট বা দেয়ালের গায়ে এদের দেখা যায়। পাহাড়ের ঢালে, পাদদেশে এবং চা বাগানে এদের পাওয়া যায়।

Pteris এর গঠন: এদের গঠন দু’ভাবে আলোচনা করা যায়। (ক) বাহ্যিক গঠন এবং (খ) অভ্যন্তরীণ গঠন।

বাহ্যিক গঠন- Pteris উদ্ভিদ স্পোরোফাইট বা রেণুধর উদ্ভিদ (ডিপ্লয়েড)। Pteris সাধারণত বিরুৎ জাতীয় উদ্ভিদ এবং মূল, কান্ড ও পাতায় বিভক্ত। কান্ড রাইজোম প্রকৃতির। রাইজোম শায়িত বা অর্ধখাড়া, শাখাহীন, বাদামী বর্ণের সুতার ন্যায় শল্কপত্র বা র‌্যামেন্টা ও অস্থানিক মূল দিয়ে আবৃত। অর্ধখাড়া, যৌগিক এবং সচ‚ড় পক্ষল পাতাকে ফ্রন্ড বলা হয়। কচি অবস্থায় পাতা কুন্ডলিত থাকে। একে সারসিনেট ভার্নেশন বলে। যৌগিক পাতার প্রতিটি পত্রকখন্ডকে পিনা বলে। প্রতিটি পিনা অবৃন্তক, সরু, লম্বা, অনেকটা চর্মের ন্যায় ও অমসৃণ। প্রতিটি পিনার একটি প্রধান শিরা থাকে। পত্রকগুলো পত্রক অক্ষের দু’পাশে জোড়ায় জোড়ায় সাজানো থাকে। পত্রক অক্ষকে র‌্যাকিস বলে।

অভ্যন্তরীণ গঠন- অভ্যন্তরীণ গঠনে নিম্নলিখিত অংশগুলো থাকে।

রাইজোম: রাইজোম এক প্রকার অসংখ্য বাদামি রঙের শল্কপত্র দিয়ে আবৃত থাকে। এর কান্ডের বাইরে বহিঃত্বকে (Epidermis) পারেনকাইমা কোষের একটি স্তর বিদ্যমান থাকে। বহিঃত্বক দিয়ে পরিবেষ্টিত অবস্থায় দু’স্তরবিশিষ্ট অধঃত্বক (Hypodermis) থাকে। অধঃত্বক দিয়ে পরিবেষ্টিত অবস্থায় বহুস্তরবিশিষ্ট কর্টেক্স (Cortex) অবস্থিত। কর্টেক্সের একাধিক পরিবহন টিস্যুগুচ্ছ রয়েছে। পরিবহন টিস্যু হ্যাড্রোসেন্ট্রিক অর্থাৎ কেন্দ্রে জাইলেম এবং চারদিকে ফ্লোয়েম টিস্যু বিদ্যমান থাকে।

র‌্যাকিস: র‌্যাকিসের প্রস্থচ্ছেদে বাইরে এপিডার্মিস, এপিডার্মিস দিয়ে পরিবেষ্টিত অবস্থায় ক্লোরেনকাইমাযুক্ত কোষের অধঃত্বক অবস্থিত। অধঃত্বক দিয়ে পরিবেষ্টিত অবস্থায় বহুস্তরবিশিষ্ট কর্টেক্স অবস্থিত এবং কর্টেক্সের টিস্যুতে অশ্বক্ষুরাকৃতির স্টিলি বিদ্যমান থাকে। পরিবহন টিস্যু হ্যাড্রোসেন্ট্রিক।

Pteris এর জনন: Pteris অঙ্গজ, অযৌন এবং যৌন এ তিন পদ্ধতিতে বংশবৃদ্ধি করে। এদের মধ্যে স্পোরোফাইট উদ্ভিদে অঙ্গজ ও অযৌন এবং গ্যামিটোফাইটে যৌন জনন ঘটে।

অঙ্গজ জনন: অনেক সময় পরিণত রাইজোমের অংশবিশেষ মরে বা পঁচে গেলে রাইজোমটির অপরিণত শাখাগুলো বিচ্ছিন্ন হয়। অনুকূল পরিবেশে এসব খন্ডিত রাইজোম থেকে নতুন উদ্ভিদ সৃষ্টি হয়।

অযৌন জনন: Pteris স্পোর বা রেণু (Spores) সৃষ্টির মাধ্যমে অযৌন জনন সম্পন্ন করে। স্পোরগুলো রেণুস্থলি বা স্পোরাঞ্জিয়াম (Sporangium)-এর মধ্যে উৎপন্ন হয়। স্পোরাঞ্জিয়ামগুলো পত্রকের কিনারায় অমরা (Placenta- যে স্থান থেকে স্পোরাঞ্জিয়াম সৃষ্টি হয়) হতে উৎপন্ন হয়ে সোরাস (Sorus, বহুবচনে Sori) গঠন করে। সোরাসগুলো অবিচ্ছিন্ন অবস্থায় পত্রকের দু’কিনারা বরাবর সজ্জিত থাকে। এসব সোরাসকে সিনোসোরাস (Coenosorus) বলে। পত্রফলকের কিনারা ভেতরের দিকে একটু বেঁকে এসে সোরাইকে ঢেকে রাখে। ফলক এর এ বাঁকানো প্রান্তকে মেকী ইন্ডুসিয়াম (False indusium) বলে। প্রতিটি স্পোরাঞ্জিয়াম একটি বহুকোষী বৃন্ত (Stalk) ও ক্যাপসুল (Capsule) বা রেণু থলি দিয়ে গঠিত। ক্যাপসুলের বাইরের আবরণীর একপাশে অবস্থিত খাড়া পুরু প্রাচীরযুক্ত বলয়কে (Ring) অ্যানুলাস (Annulus) এবং বৃন্তের কাছাকাছি স্থানে পাতলা প্রাচীরযুক্ত কোষগুলোকে স্টোমিয়াম (Stomium) বলে। স্পোরাঞ্জিয়ামের ভেতর স্পোর বা রেণু উৎপাদনকারী কোষ (Sporogenous cells) থাকে। এগুলো থেকে ১৬টি স্পোর মাতৃকোষ (Spore mother cells) সৃষ্টি হয়। স্পোর মাতৃকোষগুলো স্পোরোফাইট এর অংশ অর্থাৎ ডিপ্লয়েড (2n)। পরবর্তীতে প্রতিটি স্পোর মাতৃকোষ মায়োসিস প্রক্রিয়ায় বিভক্ত হয়ে চারটি করে হ্যাপ্লয়েড (n) স্পোর সৃষ্টি করে। এ স্পোরগুলো বিভাজনের পর একত্রে অবিচ্ছিন্ন স্পোর টেট্রাড (Spore tetrad) বা রেণুচতুষ্টয় হিসেবে থাকে। পরে স্পোর টেট্রাড এর প্রতিটি স্পোর বিচ্ছিন্ন হয়। Pteris এ স্পোরগুলো সব একই রকম অর্থাৎ সমরেণুপ্রসূ (Homosporous) স্বভাবের। পরিণত স্পোরাঞ্জিয়াম শুষ্ক হলে অ্যানুলাস সংকুচিত হয় এবং পাতলা প্রাচীরযুক্ত স্টোমিয়াম অংশে ফেঁটে যায় এবং স্পোরগুলো বাইরে ছড়িয়ে পড়ে।

গ্যামিটোফাইট- স্পোর বা রেণুই হচ্ছে হ্যাপ্লয়েড (n) মিটোফাইটের প্রথম কোষ। প্রতিটি স্পোর দু’স্তরবিশিষ্ট। বাইরের পুরু ও বাদামী রং এর স্তরকে এক্সোস্পোর (Exospore) এবং ভেতরের পাতলা স্তরকে এন্ডোস্পোর (Endospore) বলে। স্পোর অনুক‚ল পরিবেশে অঙ্কুরিত হয় এবং ক্রমাগত বিভাজনের মাধ্যমে একটি বহুকোষী হৃদপিন্ডাকার অগ্রীয় খাঁজবিশিষ্ট সবুজ প্রোথ্যালাস (Prothallus) সৃষ্টি করে। প্রোথ্যালাসের নিম্নতলে নিচের অংশে অনেক এককোষী রাইজয়েড জন্মায় যা প্রোথ্যালাসকে মাটির সাথে সংযুক্ত রাখে এবং পানি ও খনিজ লবণ শোষণ করে।

Pteris এর প্রোথেলাস

যৌন জনন- প্রোথ্যালাসে যৌন জনন সম্পন্ন হয়। প্রোথ্যালাসের নিম্নতলে খাঁজের নিচে অনেকগুলো স্ত্রীধানী (Archegonia) এবং নিচের অংশে রাইজয়েড এর সাথে মিশ্রিত অবস্থায় পুংধানী (Antheridia) উৎপন্ন হয়।

আর্কিগোনিয়াম- Pteris এর আর্কিগোনিয়াম দেখতে ব্রায়োফাইটার আর্কিগোনিয়াম এর ন্যায়। এরা ফ্লাস্ক আকৃতির। এতে দুটি অংশ থাকে। গ্রীবা (Neck) এবং ভেন্টার বা উদর (Venter)। উদরের নিম্নাংশে একটি বড় ডিম্বাণু (Egg or Oosphere) এবং ডিম্বাণুর উপর একটি ভেন্ট্রাল ক্যানাল সেল বা উদরীয় নালিকা কোষ (Ventral canal cell) থাকে। গ্রীবায় অনেকগুলো গ্রীবা নালিকা কোষ (Neck canal cells) থাকে। সমস্ত আর্কিগোনিয়ামটি একস্তর জ্যাকেট কোষ দিয়ে আবৃত থাকে। আর্কিগোনিয়াম পরিণত হলে গ্রীবা নালী কোষ এবং উদরীয় নালী কোষ বিগলিত হয়ে ডিম্বাণু পর্যন্ত একটি নালীপথের সৃষ্টি করে। এ নালীপথটি মিউসিলেজ ও ম্যালিক অ্যাসিড দিয়ে পূর্ণ থাকে।

অ্যান্থেরিডিয়াম- প্রতিটি অ্যান্থেরিডিয়াম দেখতে গোলাকার, একটি একস্তরযুক্ত আবরণী দিয়ে বেষ্টিত থাকে এবং শীর্ষে কয়েকটি ঢাকনী কোষ থাকে। এর ভেতর শুক্রাণু মাতৃকোষ (Sperm mother cells) থাকে। প্রতিটি শুক্রাণু মাতৃকোষ রূপান্তরিত হয়ে একটি বহু ফ্ল্যাজেলাযুক্ত শুক্রাণুতে (Antherozoids) পরিণত হয়। অ্যান্থেরিডিয়াম এর শীর্ষে ঢাকনি কোষ বিদীর্ণ হয়ে শুক্রাণুগুলো বের হয়ে এসে বৃষ্টি বা শিশির বিন্দুর পানিতে সাঁতার কাটতে থাকে।

নিষেক: শিশির বিন্দু বা বৃষ্টির পানির সাহায্যে শুক্রাণুগুলো আর্কিগোনিয়ামের কাছে আসে। আর্কিগোনিয়ামে নিঃসৃত ম্যালিক অ্যাসিড এর আকর্ষণে শুক্রাণুগুলো গ্রীবানালি দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করে। অবশেষে একটিমাত্র শুক্রাণু ডিম্বাণুকে নিষিক্ত করে। নিষেকের ফলে সৃষ্টি হয় ডিপ্লয়েড জাইগোট বা ঊস্পোর (Zygote or oospore)।

নতুন স্পোরোফাইট- জাইগোট রেণুধর উদ্ভিদের প্রথম কোষ। জাইগোট বারবার বিভাজিত হয়ে একটি ভ্রূণে (Embryo) পরিণত হয় এবং ভ্রূণ বিকশিত হয়ে নতুন Pteris উদ্ভিদে পরিণত হয়।

জনুক্রম : Pteris উদ্ভিদ স্পোরোফাইটিক (2n)। এখানে সোরাস উৎপন্ন হয়। সোরাসে স্পোরাঞ্জিয়াম এবং স্পোরাঞ্জিয়ামের ক্যাপসুলে স্পোর মাতৃকোষ উৎপন্ন হয়। এগুলো সবই ডিপ্লয়েড স্পোরোফাইটের অংশ। ডিপ্লয়েড স্পোর মাতৃকোষ মায়োসিস প্রক্রিয়ায় বিভাজিত হয়ে হ্যাপ্লয়েড স্পোর (n) উৎপন্ন করে যা গ্যামিটোফাইটের প্রথম কোষ। এ হ্যাপ্লয়েড স্পোর অঙ্কুরিত হয়ে হ্যাপ্লয়েড প্রোথ্যালাস নামে স্বতন্ত্র গ্যামিটোফাইট সৃষ্টি করে। প্রোথ্যালাসে আর্কিগোনিয়া ও অ্যান্থেরিডিয়া এবং এদের মধ্যে যথাক্রমে হ্যাপ্লয়েড ডিম্বাণু ও শুক্রাণু সৃষ্টি হয়। ডিম্বাণু (n) ও শুক্রাণু (n) এর মধ্যে নিষেকের ফলে সৃষ্টি হয় ডিপ্লয়েড জাইগোট বা ঊস্পোর যা স্পোরোফাইট এর প্রথম কোষ। ঊস্পোর অঙ্কুরিত হওয়ার পর ক্রমাগত বিভাজিত হয়ে নতুন স্বভোজী উদ্ভিদ (2n) এ পরিণত হয়। সুতরাং দেখা যাচ্ছে, জীবনচক্র সম্পন্ন করতে স্পোরোফাইট জনু বা অযৌন জনু (Sporophyte generation) ও গ্যামিটোফাইট জনু বা যৌন জনু (Gametophyte generation) পর্যায়ক্রমে আবির্ভাব হচ্ছে। এটিই জনুক্রম। এখানে স্পোরোফাইট এবং গ্যামিটোফাইট আকার আকৃতিতে সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের তাই এ জনুক্রমকে অসম আকৃতির জনুক্রম (Heteromorphic alternation of generations) বলে।




প্রধান শব্দভিত্তিক সারসংক্ষেপ

♦ কোষ : কোষ হলো জীবদেহের গঠন ও কাজের একক, যা স্বনির্ভর ও আত্মপ্রজননশীল, বৈষম্যভেদ্য পর্দা দিয়ে পরিবেষ্টিত অবস্থায় নির্দিষ্ট পরিমাণ প্রোটোপ্লাজম নিয়ে গঠিত এবং পূর্বতন কোষ থেকে সৃষ্ট।